ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বাংলাদেশ সরকার ৩২০ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট কেনার বড় একটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই বিশাল উদ্যোগ ও সামগ্রিক ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ নিচে কয়েকটি মূল ভাগে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. কেন এত বিশাল অঙ্কের ট্যাব কেনা হচ্ছে?
বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তর দেশব্যাপী একটি সমন্বিত এবং গতিশীল ডিজিটাল ডেটাবেজ বা ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (DSR) তৈরি করছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা যেন সরাসরি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘরে ঘরে গিয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ, তাৎক্ষণিক জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও জন্মনিবন্ধন যাচাই এবং ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন, সেজন্য এই অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবগুলো অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে তথ্যের ভুলভ্রান্তি কমবে এবং কাগুজে ফর্মের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর হবে।
২. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
ট্যাবলেটগুলো কেনার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনস্থ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড, সোনাকান্দা, নারায়ণগঞ্জ-কে নির্বাচিত করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন চলমান একটি বিশেষ প্রকল্পের অধীনে এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। ১৬ আগস্ট ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিক ডেটা সংগ্রহ এবং ডিজিটাল যাচাইকরণ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৩. ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও বাজেট
- সুবিধোভোগীর সংখ্যা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। আগামী ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- আর্থিক সহায়তা: প্রতিটি ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারকে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হবে।
- নারীর ক্ষমতায়ন: এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতি পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ বা যোগ্য নারী সদস্যের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হবে এবং টাকা সরাসরি তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করা ও নারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৪. দুর্নীতি ও অপচয় রোধে প্রযুক্তিগত সুবিধা
অতীতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভুয়া সুবিধাভোগী বা একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়ার যে অভিযোগ উঠত, তা বন্ধ করতে এই প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে:
- স্মার্ট চিপ কার্ড ও TakaPay: কার্ডগুলো হবে উন্নত ডুয়াল-ইন্টারফেস স্মার্ট চিপযুক্ত, যা বাংলাদেশের নিজস্ব রিটেইল পেমেন্ট অবকাঠামো TakaPay এর সাথে যুক্ত থাকবে।
- আইবাস (iBAS++) সিস্টেম: কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরকারি ট্রেজারি থেকে সরাসরি সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাবে।
- স্বচ্ছতা: সরকারি চাকুরে, পেনশনার, গাড়ি বা এসি-র মতো বিলাসবহুল পণ্যের মালিকরা এই কার্ড পাবেন না। ট্যাব দিয়ে ডেটা সংগ্রহের সময়ই ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ভূমিহীন, গৃহহীন ও প্রান্তিক দরিদ্রদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
এক নজরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেটকে ২০২৮ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

No comments:
Post a Comment