জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম পেপার (Term Paper) তৈরির বিস্তারিত নির্দেশিকা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স বা অনার্স শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের জন্য টার্ম পেপার তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ। এটি শিক্ষার্থীদের গবেষণা দক্ষতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং অর্জিত জ্ঞানকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োগ করার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি কার্যকর মাধ্যম। এই নির্দেশিকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম পেপার তৈরির নিয়মাবলী, কাঠামো এবং সফলভাবে এটি সম্পন্ন করার কৌশল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. টার্ম পেপার কী?
টার্ম পেপার হলো একটি নির্দিষ্ট সেমিস্টার বা কোর্সের শেষে জমা দিতে হয় এমন একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা একাডেমিক অ্যাসাইনমেন্ট। এটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের জন্য এই টার্ম পেপারের জন্য সাধারণত ৫০ নম্বর বরাদ্দ থাকে।
২. টার্ম পেপারের আদর্শ কাঠামো (Structure)
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম পেপারকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করতে হয়। এই কাঠামোটি নিশ্চিত করে যে আপনার কাজটি একটি প্রমিত একাডেমিক মান বজায় রাখছে। একটি পূর্ণাঙ্গ টার্ম পেপারের প্রধান অংশগুলো নিম্নরূপ:
| ক্রম | অংশের নাম (বাংলা) | অংশের নাম (ইংরেজি) | সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
| ১ | কাভার পৃষ্ঠা | Cover Page | শিক্ষার্থীর তথ্য, কোর্সের বিবরণ, তত্ত্বাবধায়ক এবং জমা দেওয়ার তারিখ সম্বলিত প্রথম পৃষ্ঠা। |
| ২ | শিক্ষার্থীর ঘোষণাপত্র | Student's Declaration | এটি নিশ্চিত করে যে কাজটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব এবং এটি কোথাও থেকে নকল করা হয়নি। |
| ৩ | তত্ত্বাবধায়কের প্রত্যয়নপত্র | Acceptance Letter | তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের পক্ষ থেকে কাজের অনুমোদন ও মান নিশ্চিতকরণ। |
| ৪ | কৃতজ্ঞতা স্বীকার | Acknowledgment | যারা টার্ম পেপার তৈরিতে সাহায্য করেছেন (শিক্ষক, পরিবার, সহপাঠী) তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। |
| ৫ | মুখবন্ধ | Preface | লেখক কর্তৃক তার কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা। |
| ৬ | সারসংক্ষেপ | Abstract | পুরো গবেষণার মূল উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং উপসংহারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ (সাধারণত ২০০-৩০০ শব্দ)। |
| ৭ | সূচীপত্র | Table of Contents | টার্ম পেপারের সকল অধ্যায়, উপ-অধ্যায় এবং তাদের পৃষ্ঠা নম্বর। |
| ৮ | মূল অংশ | Body of the Term Paper | গবেষণার বিষয়বস্তু, তত্ত্ব, তথ্য এবং বিশ্লেষণের প্রধান অংশ (সাধারণত ২৫-৩০ পৃষ্ঠা)। |
| ৯ | উপসংহার | Conclusion | গবেষণার মূল আলোচনা ও প্রাপ্ত ফলাফলের সারসংক্ষেপ এবং সুপারিশ। |
| ১০ | গ্রন্থপুঞ্জি | Reference/Bibliography | টার্ম পেপারে ব্যবহৃত সকল উৎসের বিস্তারিত তালিকা। |
| ১১ | পরিশিষ্ট | Appendix | অতিরিক্ত তথ্য, ডেটা, প্রশ্নাবলী বা চার্ট যা মূল অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। |
৩. টার্ম পেপার তৈরির ধাপসমূহ (Step-by-Step Guide)
টার্ম পেপার তৈরির প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যেতে পারে:
ধাপ ১: বিষয় নির্বাচন ও অনুমোদন (Topic Selection and Approval)
•বিষয় নির্বাচন: আপনার কোর্সের সাথে সম্পর্কিত এবং আপনার আগ্রহ আছে এমন একটি বিষয় নির্বাচন করুন। বিষয়টি যেন সুনির্দিষ্ট এবং গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় এমন হয়।
•তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচন: আপনার বিভাগের একজন শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করে তাকে আপনার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নির্বাচন করুন।
•অনুমোদন: নির্বাচিত বিষয়টি তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের কাছে উপস্থাপন করুন এবং তার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিন।
ধাপ ২: তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা (Data Collection and Research)
•প্রাথমিক গবেষণা: আপনার নির্বাচিত বিষয়ের উপর বই, জার্নাল, একাডেমিক প্রবন্ধ, সংবাদপত্র এবং অনলাইন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন।
•উৎস যাচাই: সংগৃহীত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করুন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমের উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে।
•নোট তৈরি: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, উদ্ধৃতি এবং পরিসংখ্যানগুলো টুকে রাখুন এবং কোন উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে তা নোট করুন (গ্রন্থপুঞ্জির জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি)।
ধাপ ৩: লেখা ও বিন্যাস (Writing and Formatting)
•ভূমিকা (Introduction): এখানে গবেষণার পটভূমি, সমস্যার বিবৃতি, গবেষণার উদ্দেশ্য এবং টার্ম পেপারের কাঠামো সংক্ষেপে তুলে ধরুন।
•সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature Review): আপনার বিষয়ের উপর পূর্বে প্রকাশিত কাজগুলো পর্যালোচনা করুন এবং আপনার গবেষণা কীভাবে সেই জ্ঞানের শূন্যতা পূরণ করবে তা ব্যাখ্যা করুন।
•পদ্ধতি (Methodology): আপনি কোন পদ্ধতিতে গবেষণা করেছেন (যেমন: জরিপ, কেস স্টাডি, গুণগত/পরিমাণগত বিশ্লেষণ) তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন।
•ফলাফল ও বিশ্লেষণ (Results and Analysis): সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করুন এবং সেগুলোর বিশ্লেষণ করে আপনার গবেষণার মূল ফলাফল তুলে ধরুন। প্রয়োজনে টেবিল, চার্ট বা গ্রাফ ব্যবহার করুন।
•উপসংহার (Conclusion): আপনার গবেষণার মূল ফলাফলগুলো সংক্ষেপে পুনরাবৃত্তি করুন। গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আরও কী গবেষণা করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে সুপারিশ দিন।
ধাপ ৪: গ্রন্থপুঞ্জি ও উদ্ধৃতি (Reference and Citation)
•গ্রন্থপুঞ্জি (Reference/Bibliography): আপনার টার্ম পেপারে ব্যবহৃত প্রতিটি উৎসের বিস্তারিত তথ্য একটি নির্দিষ্ট শৈলীতে (যেমন: APA, MLA) তালিকাভুক্ত করুন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আপনার বিভাগ বা তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃক নির্ধারিত শৈলী অনুসরণ করা উচিত।
•উদ্ধৃতি (Citation): মূল অংশের মধ্যে যখনই কোনো তথ্য বা ধারণা অন্য কোনো উৎস থেকে নেওয়া হবে, তখনই যথাযথভাবে সেই উৎসের উল্লেখ করুন।
ধাপ ৫: চূড়ান্ত পর্যালোচনা ও জমা (Final Review and Submission)
•প্রুফরিডিং: বানান, ব্যাকরণ এবং বাক্য গঠনের ভুলগুলো সতর্কতার সাথে সংশোধন করুন।
•বিন্যাস পরীক্ষা: টার্ম পেপারের কাঠামো, ফন্ট সাইজ, মার্জিন এবং পৃষ্ঠার ক্রম ঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।
•তত্ত্বাবধায়কের স্বাক্ষর: তত্ত্বাবধায়কের প্রত্যয়নপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফর্মে তার স্বাক্ষর নিন।
•জমা দেওয়া: নির্ধারিত তারিখের মধ্যে আপনার বিভাগীয় প্রধানের কাছে টার্ম পেপারটি জমা দিন।
৪. কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস (Important Tips)
•পৃষ্ঠা সংখ্যা: মূল অংশটি সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ পৃষ্ঠার মধ্যে হওয়া উচিত। তবে এটি আপনার কোর্স এবং বিভাগের নির্দেশনার উপর নির্ভর করে।
•ফন্ট: বাংলা লেখার জন্য সাধারণত SutonnyMJ বা SolaimanLipi এবং ইংরেজি লেখার জন্য Times New Roman ফন্ট ব্যবহার করা হয়। ফন্ট সাইজ সাধারণত ১২ বা ১৪ হতে পারে।
•মার্জিন: সাধারণত বাম দিকে ১.৫ ইঞ্চি এবং ডান, উপরে ও নিচে ১ ইঞ্চি মার্জিন রাখা হয়।
•লাইন স্পেসিং: ১.৫ লাইন স্পেসিং ব্যবহার করা আদর্শ।
•প্লাজিয়ারিজম (Plagiarism): অন্যের লেখা বা ধারণা সরাসরি কপি করা থেকে বিরত থাকুন। প্রতিটি তথ্যসূত্র সঠিকভাবে উল্লেখ করুন। এটি একটি গুরুতর একাডেমিক অপরাধ।
এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে আপনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মানসম্মত এবং সফল টার্ম পেপার তৈরি করতে পারবেন। আপনার তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন